বিএমটিভি নিউজ ডেস্কঃ ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক নিদর্শন আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলের ভিতর সীমানা প্রাচীর নির্মাণের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন শহরের নাগরিকরা।
ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক নিদর্শন আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলের ভিতর সীমানা প্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকারি একটি স্কুল। এতে স্থাপনাটি সৌন্দর্যহানির অভিযোগ তুলেছেন শহরের নাগরিকরা।
ময়মনসিংহ জেলার ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৮৮৯ সালে নগরীর আদালত পাড়ায় মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী ২৭ একর জমিতে লোহার প্রসাদটি নির্মাণ করেছিলেন।
সেখানে এখন সরকারি ল্যাবরেটরি হাইস্কুল, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, উচ্চমাধ্যমিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউটসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
এর মধ্যে সরকারি ল্যাবরেটরি হাইস্কুল কয়েকদিন আগে অভ্যন্তরীণ সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু করে। এর প্রতিবাদে সোমবার দুপুরে ‘আমরা ময়মনসিংহবাসী’র ব্যানারে বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, “কারো সঙ্গে কোনো সমন্বয় না করে কীভাবে ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়? জেলা প্রশাসন এ ব্যাপারে নীরব কেন?
এই স্থাপনা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন ছেড়ে যাব না। এর দায় জেলা প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক কবি স্বাধীন চৌধুরী বলেন, “আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলে নয়টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কোনোদিন তাদের কোনো সমস্যা হয়নি। শুধু সরকারি ল্যাবরেটরি স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমস্যা। এটা একটা অহেতু কারণ।
“সবগুলো প্রতিষ্ঠান ঘিরেই বাউন্ডারি রয়েছে। এখন বাউন্ডারির ভেতরে বাউন্ডারি হবে, তা কোনোভাবেই সম্ভব না।
জেলা জনউদ্যোগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম চুন্নু বলেন, “এখানে রবীন্দ্র বটমূল রয়েছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অসংখ্য গুণীজন এখানে এসেছিলেন।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার অজুহাতে সৌন্দর্য বিনষ্ট করার অধিকার কারো নেই। জনগণকে ক্ষেপিয়ে ফায়দা হাসিল করা যাবে না। ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক এই ঐতিহাসিক নিদর্শনকে কোনোভাবেই বিনষ্ট হতে আমরা দেব না।
ব্রহ্মপুত্র সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, “প্রতিবাদের কোনো বিকল্প নেই। কারো শক্তি নেই জনশক্তি উপেক্ষা করে প্রাচীর নির্মাণ করার। দুর্বার প্রতিহতের মাধ্যমে প্রাচীর নির্মাণ বন্ধ করা হবে।
এ বিষয়গুলো নিয়ে কেন আমাদের আন্দোলন করতে হয়? যানজটের শহরে আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল সাধারণ মানুষের প্রশান্তির জায়গা। সেটা প্রশাসনসহ সর্বস্তরের মানুষের জানা।
সাংস্কৃতিক কর্মী অনুপ চৌধুরী বলেন, প্রাচীর নির্মাণ হলে শিক্ষার্থীরা সুরক্ষার বদলে অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে আবদ্ধ হবে। খোলামেলা পরিবেশ মানুষকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে। শিক্ষার্থীদের অন্ধকারে ঠেলে দিতে আমরা চাই না।
কাব্য সুমি সরকার বলেন, সারা বিশ্বে ঐতিহাসিক স্থাপনা সুরক্ষিত করে রাখে সরকার। আর বাংলাদেশে তা বিনষ্ট করা হচ্ছে। আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে জানান দিতে চাই, ঐতিহাসিক কোনো স্থাপনা ময়মনসিংহ নষ্ট হতে দেবে না।
পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শিব্বির আহম্মেদ লিটন বলেন, “ময়মনসিংহের মানুষ এতোটা বোকা না। যারা প্রাচীর নির্মাণ করে পরিবেশ বিনষ্টের পাশাপাশি অর্থ হাতানোর চিন্তাভাবনা করছেন তাদের উদ্দেশ্য কখনো সফল হবে না। দ্রুত নির্মাণাধীন দেয়াল ভেঙে ইট-বালু সরাতে হবে। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের সরাতে বাধ্য করাতে হবে।
তবে সরকারি ল্যাবরেটরি হাইস্কুল কর্তৃপক্ষ বলছে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে এটা করা হচ্ছে। না বুঝে কেউ হয়তো অপপ্রচার করছে।
সরকারি ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, “আমাদের ভালো উদ্দেশ্যকে একটি মহল অন্যভাবে নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে ২৫০ ফিট দৈর্ঘ্য এবং চার ফুট উচ্চতার নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলাম। দুই দিন কাজের পর বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসক কাজ বন্ধ রাখতে বলেন। আপাতত কাজ বন্ধ রয়েছে।
আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। সেটি কোনো কারণে বিনষ্ট হোক আমরা তা চাই না। কিন্তু স্কুলের মেয়েরা প্রতিনিয়ত বখাটেদের ইভটিজিংয়ের শিকার হচ্ছে। যার জন্য এই উদ্যোগ আমাদের ছিল। এখন জেলা প্রশাসক যা সিদ্ধান্ত দিবেন আমরা তাই করব।
স্কুলের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক তাপস মজুমদার বলেন, “শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ইটের দুই ফুট গাঁথুনি দিয়ে স্টিলের রেক বসিয়ে চার ফুট উঁচু ব্যারিকেডের কাজ হচ্ছিল। প্রতিষ্ঠানটি আমাদের সবার। যাদের ছেলেমেয়রা এখানে পড়াশোনা করে তারাই শুধু নিরাপত্তার বিষয়টি বুঝেন। অন্যরা হয়তো সেটি না বুঝে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
আমরাও চাই না ঐতিহাসিক নিদর্শন আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলের সৌন্দর্যহানি ঘটুক।
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামূল হক বলেন, “সীমানা প্রাচীর নির্মাণের বিষয়টি প্রথমে আমি অবগত ছিলাম না। এ বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বসে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ।