পর্যটন সম্ভাবনায় ময়মনসিংহ বিভাগ

image

You must need to login..!

Description

মো. রিদওয়ানুর রহমান রুবাইয়াৎ

আধুনিক বিশ্বে একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পর্যটন এক অনন্য ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। বিশ্বে এমন বেশ কিছু রাষ্ট্র রয়েছে যাদের সামগ্রিক অর্থনীতি পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মালদ্বীপ, শ্রীলংকা, নেপালের মতো দেশগুলোতে পর্যটনকে ঘিরে অর্থনীতির বৃহদাংশ পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পর্যটনের অমিত সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে ব্যবস্থাপনার জায়গায় কিছু ঘাটতির কারণে দেশের অর্থনীতিতে এখনও পর্যটন সেভাবে ভূমিকা রাখতে পারছে না। বাংলাদেশের উত্তর-মধ্যভাগে অবস্থিত ময়মনসিংহ বিভাগে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার মতো বেশ কিছু অঞ্চল রয়েছে। সম্ভাবনার দিক থেকে তাকালে দেখা যাবে, পর্যটনে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চল হিসেবে গড়ে ওঠার প্রতিশ্রুতি এই বিভাগের রয়েছে।


ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলা- ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর ও জামালপুর, সবকটি জেলার সাথেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাহাড়, গারো পাহাড়ের সংলগ্নতা রয়েছে। গারো পাহাড় মেঘালয় রাজ্যের গারো-খাসিয়া পর্বতমালার একটি অংশ। আর ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাসমূহের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেই মূলত গারো পাহাড়ের অবস্থান মেলে। আবার, বিভাগের সীমান্তবর্তী অনেক এলাকার সাথে পার্বত্যাঞ্চলের সংযোগ থাকায় এই অংশগুলোতে প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্যের নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিবছর এ স্থানগুলোতে বহু পর্যটকের দেখা মেলে। বিভাগের পাহাড়ি পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের গাবরাখালী গারো পাহাড়, নেত্রকোনা কলমাকান্দার পাচগাঁও, নেত্রকোনা দুর্গাপুরের বিজয়পুর সাদামাটির পাহাড়, শেরপুরের ঝিনাইগাতীর গজনি অবকাশকেন্দ্র, জামালপুরের বকশীগঞ্জের লাউচাপড়া পিকনিক স্পট প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।


ঐতিহাসিকভাবে ময়মনসিংহ বিভাগে রাজা, জমিদার, বড় ভূ-পতিদের উপস্থিতির নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়। বিভাগজুড়ে রয়েছে বহু রাজবাড়ি, জমিদারবাড়ির উপস্থিতি। ময়মনসিংহ শহরের মাঝে মহারাজা সূর্যকান্ত নির্মিত লোহার বাড়ি (আলেকজান্ডার ক্যাসেল), মহারাজা শশীকান্ত আচার্য নির্মিত রাজবাড়ি (বর্তমান শশীলজ), ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছার রাজবাড়ি বা আটআনী জমিদারবাড়ি, গৌরীপুর উপজেলার রামগোপালপুর জমিদারবাড়ি, ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারবাড়ি জমিদারবাড়ি, শেরপুর জেলার পৌনে তিনআনী জমিদারবাড়ি, নয়আনী জমিদারবাড়ি নাটমন্দির এদের মাঝে উল্লেখযোগ্য।


ঐতিহাসিক এসব নিদর্শনসমূহ পরিদর্শণের মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসের অংশ হওয়ার সুযোগ মেলে। এছাড়াও বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলে আরো অনেক জমিদারবাড়ি খুঁজে পাওয়া যায়।

ময়মনসিংহ শহরের একপাশে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতে স্থাপত্যশিল্পের অনন্য
নির্মাণশৈলী হিসেবে বিজয় ৭১ ও বিভিন্ন ভাস্কর্য খুঁজে পাওয়া যায়। এখানে রয়েছে আমবাগান, দুস্প্রাপ্য বৃক্ষরাজিসমৃদ্ধ বোটানিক্যাল গার্ডেন। অত্যন্ত সুন্দর ও মনোরমপরিবেশে এ বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত। বিভাগের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানসমূহের মধ্যে রয়েছে ময়মনসিংহের ত্রিশালের কবি নজরুল ইসলামের স্মৃতিময় দরিরামপুর, জয়নুল আবেদীন সংগ্রহশালা, জামালপুরের হযরত শাহজামাল (রা.) ও হযরত শাহকামাল (রা.) এর মাজার শরীফ, যমুনা ফার্টিলাইজার, শেরপুরের অর্কিড পর্যটনকেন্দ্র, নাকুগাঁও স্থলবন্দর, নেত্রকোনার হযরত শাহ সুলতান কমরউদ্দিন রুমী (রা.) এর মাজারশরীফ, বিরিশিরি কালচারাল একাডেমী, কমলারানীর দীঘি, রাশমণি স্মৃতিসৌধ, সাত শহীদের মাজার প্রভৃতি।
বিভাগের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে রয়েছে সমৃদ্ধ উপজাতি ঐতিহ্য। সংখ্যাগরিষ্ঠ গারো অধ্যুষিত বিভাগের এ অঞ্চলসমূহ। কয়েকটি উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো ঘুরে দেখার মধ্য দিয়ে উপজাতি সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ মেলে। ময়মনসিংহজেলার ভালুকা উপজেলার প্রায় ২১ ভাগ জায়গা জুড়ে গড়ে উঠেছে কাদিগর জাতীয় উদ্যান। জেলার ফুলবাড়িয়া সন্তোষপুর রাবারবাগানে প্রকৃতির সান্নিধ্যলাভের পাশাপাশি অসংখ্য বানরের দেখা মিলবে। ময়মনসিংহ বিভাগের নিম্নাঞ্চল জুড়ে রয়েছে হাওর ও বিল।
হাওর এলাকাগুলোতে বিশেষকরে বর্ষার সময় এক অন্যরকম সৌন্দর্য্যের দেখা মেলে।  একথা সত্য যে, অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গড়ে ওঠার সমস্ত প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও এ বিভাগের দর্শনীয় স্থানগুলোকে সেভাবে উপস্থাপন করা অনেকাংশেই সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এর পেছনে দৃশ্যমান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করা যায় যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতার কথা। নদী-হাওরবেষ্টিত হওয়ার কারণে নিম্নাঞ্চলগুলোতে এবং পর্যটন স্পটগুলোতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কিছু এলাকায় উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সরকারি নানা উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নানা কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে এবং এ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অনেক পর্যটন স্পটগুলোতে যাতায়াতের জন্য উপযুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
পর্যটনের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন বা প্রচারণা অন্যতম ভূমিকা পালন করে। দেশের অবহেলিত নানা পর্যটন স্পটসমূহকে পাদপ্রদীপের আলোয় তুলে আনার ক্ষেত্রে ইউটিউব, ফেসবুকের মতো সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মসমূহ বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
সরকারি ওয়েবপোর্টাল, ওয়েবসাইটগুলোতেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পর্যটন স্পটগুলোর পরিচিতিসহ ভ্রমণ গাইড খুঁজে পাওয়া যায়। ময়মনসিংহ বিভাগের সরকারি, প্রশাসনিক ওয়েবসাইটগুলোতে এ অঞ্চলের পর্যটন স্থানগুলোর বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের গাবরাখালী পার্কটিকে পর্যটনস্পট হিসেবে তুলে আনতে প্রশাসনিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণার পাশাপাশি পার্কটির সংস্কারেও নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা, পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। যা কিনা ময়মনসিংহ বিভাগের পর্যটন এলাকাগুলোকে উঠিয়ে আনার প্রচেষ্টার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
পর্যটকদের থাকা ও খাওয়ার সুব্যবস্থা একটি অঞ্চলের পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে দূর-দূরান্তের পর্যটকগণ সে অঞ্চল ভ্রমনে আগ্রহী হন না। একথা সত্য যে, ময়মনসিংহ বিভাগের উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত মানসম্মত হোটেল, রেস্তোরাঁ এখনো অপ্রতুল। তবে, ভ্রমণপিপাসুদের থাকা, খাওয়ার জন্য বিভাগের জেলাপর্যায়ে সন্তোষজনক ব্যবস্থা রয়েছে। যদিও স্থানীয় উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে পর্যটকদের এ ব্যাপারে আরও বহুগুণ অধিক সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে।
ময়মনসিংহ বিভাগ বিভিন্ন দিক দিয়ে বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ বিভাগ। এই অঞ্চলের রয়েছে সুদীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। শিক্ষা, সাহিত্য, চিত্রকর্ম, নাটক, সংগীত, রাজনৈতিক নেতৃত্বসহ সকলক্ষেত্রে এ বিভাগ বহু মনীষীর পূণ্য জন্মভূমি। পাহাড়, হাওর, বন, সমতলভূমির সমন্বয়ে এক বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এ বিভাগ।
বৈচিত্র্যময় এ ভূখণ্ডে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার মতো বহু কিছু রয়েছে। বিভাগের দর্শনীয় স্থান ও অবকাঠামোগুলো নিশ্চিতভাবেই ভ্রমণলিপ্সু অভিযাত্রীদের সন্তুষ্ট করবে। আর পর্যটনে সফলতার মধ্য দিয়ে এ বিভাগ নিজ অঞ্চল এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বিশাল অবদান রাখতে সক্ষম। এর জন্য প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশিস্থানীয় জনগণকেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রচারণার মধ্য দিয়ে যেমন দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এ বিভাগের পর্যটন স্পটগুলোকে তুলে ধরা যায়, তেমনি পর্যটনেউদ্যোক্তা হিসেবেও স্থানীয় একটি শ্রেণি তৈরি করা সম্ভব। পর্যটন সম্ভাবনার সফল বাস্তবায়ন হলে কেবল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, সামগ্রিকভাবেই বিভাগের সকল সেক্টরের অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটবে।

লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, ময়মনসিংহ।

প্রধান সম্পাদকঃ
মতিউল আলম

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ
মাকসুদা আক্তার