মোঃ মাসুদ মিয়া
হঠাৎ ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট জ্বরে কাবু হয়ে রাজু (ছদ্মনাম) এক সপ্তাহ ধরে অফিসে আসছেন না। খোঁজ নিয়ে জানা গেল তিনি প্রচন্ড জ্বরে আক্রান্ত। ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে ডাক্তার নিশ্চিত করে বলছে না এটা কোন ধরণের জ্বর। এটা করোনা, ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া নয়, এক ধরণের ভাইরাল জ্বর। যে পরিবারের একজন সদস্য এ জ্বরে আক্রান্ত, পর্যায়ক্রমে পরিবারের সকল সদস্য এ জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। এক সপ্তাহ বা দশ দিনব্যাপী গায়ে-ব্যথা, ক্লান্তি, অবসাদ, ক্ষুধামন্দা চলতেই থাকে। বয়স্ক বা শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরো ভয়াবহ। আবহাওয়ার প্রতিনিয়ত তারতম্যের কারণে শরীরের তাপমাত্রা উঠানামা করে।
মানুষের শরীরে জ্বর ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়ে থাকে। ভাইরাসজনিত সংক্রমণের কারণে শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়াকে ভাইরাল জ্বর বলে। এ জ্বরের বিপরীতে বিশ্বে এখনো পর্যন্ত কোনো অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হয়নি। ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের বিপরীতে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয়। ভাইরাল জ্বর বিভিন্ন ভাইরাসের কারণে হতে পারে, যার মধ্যে ফ্লু, সর্দি এবং আরও গুরুতর অসুস্থতার জন্য দায়ী ভাইরাসও অন্তর্ভুক্ত। অনেকেই বলে থাকে ভাইরাসজনিত জ্বরে ওষুধ খেলে সেরে উঠতে সাতদিন লাগে, ওষুধ না খেলে এক সপ্তাহে ভালো হয়। অর্থাৎ ভাইরাসজনিত জ্বর সারানোয় ওষুধের ভূমিকা নেই বললেই চলে। ভাইরাল সংক্রমণ সাধারণত সহায়ক যত্ন এবং সময়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
ভাইরাল সংক্রমণ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এয়ারবর্ন ট্রান্সমিশন যেমন কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে; সরাসরি দূষিত পৃষ্ঠ বা বস্তু স্পর্শ করা এবং তারপর আপনার মুখ স্পর্শ করা; সংক্রমিত ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ শারীরিক যোগাযোগ; দূষিত খাবার বা পানি খাওয়া; ভাইরাস বহনকারী মশা বা অন্যান্য পোকামাকড়ের কামড় এবং সংক্রামিত প্রাণীদের সাথে কাছাকাছি থাকা ইত্যাদি কারণে এটি এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির নিকট স্থানান্তরিত হয়। তাই জীবাণু বহন করে এমন ব্যক্তি বা বস্তুর সংস্পর্শে না এসে যথাসম্ভব দুরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে।
যেকোনো বয়সের মানুষই এ জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। প্রাপ্ত বয়স্ক লোকের জন্য মূল লক্ষণগুলো হলো হঠাৎ করে জ্বর (১০৩°–১০৪° ফারেনহাইট পর্যন্ত); শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা (মাসল, জয়েন্ট, চোখ, মাথা); তীব্র দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, প্রেসার লো হয়ে যাওয়া; জ্বর চলে যাওয়ার পরও শরীরের ব্যথা ও দুর্বলতা রয়ে যায়।
বাচ্চারাও এ ভাইরাল জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে। আপনার সন্তান আক্রান্ত হলে আপনি ভেঙে পড়বেন না। আপনার শক্ত মনোবলই তার সেবা করার মূল চাবিকাঠি। অধিকাংশ শিশুরা এই জ্বরে ভুগছে, সবসময় বলে, “মাথা ব্যথা, পা ব্যথা…” তাকে ২০-৩০ মিনিট পরপর অল্প অল্প করে স্বাস্থ্যকর খাবার দিতে হবে। খাবারের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। মেডিসিন দিয়ে রোগ সারানো যাবে না যদি শরীর ঠিকভাবে পুষ্টি না পায়। বমি হলে প্রথমে বমি বন্ধের ওষুধ দিন (ডাক্তারের পরামর্শে। তারপর খাবার দিন।
জ্বর হলে অনেকেই ঘাবড়ে যান, ঘাবড়ানো মোটেই উচিৎ নয়। যেহেতু ভাইরাসজনিত জ্বরের প্রথাগত চিকিৎসা প্রায় নেই বললেই চলে। সবচেয়ে বড় ওষুধ হচ্ছে বিশ্রাম। জ্বরে কাবু হলে শরীর এমনিতেই দুর্বল হয়ে যায়, তার উপর স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক পরিশ্রম করে যাওয়া মোটেও কাম্য নয়। বিশ্রামের পাশাপাশি ব্যথা ও জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল (ডাক্তারের পরামর্শে); গরম পানির সেঁক; আদা, তুলসি ও মধুর গরম পানীয়; প্রয়োজন হলে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। জ্বরের পর দুর্বলতা ও ব্যথা কমাতে গরম পানিতে লবণ মিশিয়ে গা মুছানো; নারকেল তেল/পুদিনা তেল ব্যবহার করে ম্যাসাজ করা; হালকা স্ট্রেচিং বা ধীরে হাঁটা শুরু করা এবং ম্যাগনেসিয়াম-যুক্ত খাবার (পানিতে ভেজানো বাদাম, কলা, কিশমিশ) খাওয়া খুবই উপকার দেয়।
জ্বর হলে ক্ষুধামন্দা ও খাবারের অরুচি চলে আসে। তবুও যেহেতু ভাইরাসজনিত জ্বরের মেডিসিন বিষয়ক কোনো চিকিৎসা নেই, তাই খাবার গ্রহণে সতর্ক হওয়া উচিৎ। শরীর খাদ্য থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেলে দ্রুত আরোগ্য লাভ করা সম্ভব। খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে ভিটামিন সি-যুক্ত ফল যেমন মাল্টা, কমলা, লেবু, আমলকি, পেয়ারা; জিঙ্ক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফল যেমন কলা, পেঁপে, ডিমের কুসুম; প্রোটিনের উৎস যেমন সিদ্ধ ডিম, চিকেন স্যুপ, ডাল, খিচুড়ি, মাছ; দিনে অন্তত ৩ লিটার পানি (স্যালাইন, লেবুর শরবত) খেলে খুব দ্রুত রিকভারি সম্ভব। এ সময় চিনি এড়িয়ে চলা ভালো। ভিটামিন শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে।
তীব্র জ্বর আসে যা ১০৩°/১০৪° ফারেনহাইট এর মতো উঠে যায়। সাথে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় তীব্র ব্যথা আর ভয়াবহ রকমের দূর্বলতা থাকে, প্রেসার লো হয়ে যায়।
ব্লাড টেস্ট করালে দেখা যায় এটা ডেঙ্গুও না, চিকনগুনিয়াও না। কিন্তু ভয়াবহ এক জ্বর, হসপিটালাইজডও হওয়া লাগতে পারে। বারবার উচ্চ জ্বর; রক্তচাপ খুব নিচে নেমে যাওয়া; পানি ও খাবার একদম খেতে ইচ্ছে না হওয়া; চোখে ঝাপসা দেখা ও অজ্ঞান ভাব এবং অনিয়মিত হৃদস্পন্দন দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলা এবং খাবার খেলে নির্দিষ্ট সময় পর জ্বর সেরে যাবে। আর জ্বর সেরে গেলেও শরীরের ব্যথা সহজে সারে না, শরীর দুর্বল থাকে। তাই বিশ্রামের বিকল্প নেই। বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, এবং তরল পানিই দ্রুত সুস্থ হওয়ার মূল উপায়।
কথায় বলে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। কোনো রোগ বা অসুস্থতা হওয়ার পর চিকিৎসা করে সুস্থ হওয়ার চেয়ে রোগ যাতে না হয় সে চেষ্টা করা উচিৎ। যেকোনো অসুস্থতা প্রতিরোধে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা জরুরি। ভাইরাল জ্বর প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়া, কমপক্ষে ৬০% অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার; অসুস্থ ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকুন এবং ভাইরাল সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেওয়া ব্যক্তিদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে চলা; একটি শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং পর্যাপ্ত ঘুমানো অবশ্য করণীয়। এছাড়াও টিকা গ্রহণ করতে হবে, এটি শরীরে জীবাণুর বিরুদ্ধে এন্টিবডি ও স্বতঃঅনাক্রম্যতা তৈরি করে। বর্তমানে সরকার সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচীর (ইপিআই) আওতায় ১০ ধরণের টিকা বিনামূল্যে দিয়ে থাকে। এছাড়াও করোনার টিকা এবং সময়ে সময়ে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পরা অন্যান্য রোগের টিকাও বিনামূল্যে দিচ্ছে। রোগ প্রতিরোধে সচেতনতার বিকল্প নেই। সতর্ক হন, সুস্থ থাকুন।
লেখকঃ বিসিএস (তথ্য) ক্যাডার অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস (পিআইডি), ময়মনসিংহ।