বিধিমালায় আসন্ন সংসদ নির্বাচনে পোস্টারের ব্যবহার বন্ধ

বিধিমালায় আসন্ন সংসদ নির্বাচনে পোস্টারের ব্যবহার বন্ধ

BMTV Desk No Comments

মোঃ মাসুদ মিয়া

‘আমার ভোট আমি দিবো, যাকে খুশি তাকে দিবো, বুঝে শুনে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করবো’ দেশের সাধারণ জনগণের দীর্ঘদিনের চাওয়া এ ভোটাধিকার সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের সাংবিধানিক অধিকারকে নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এখন দেশে বইছে নির্বাচনী আমেজ। যদিও শুরুটা বাংলাদেশের দ্বিতীয় সংসদখ্যাত ডাকসু (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ) নির্বাচনের মাধ্যমে যা আগামী ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাকসু), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বৃহৎ পরিসরে সারাদেশব্যাপী নির্বাচন হবে ২০২৬ এ যা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থায় ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন পেয়ে সরকার নির্বাচিত হয়ে থাকে। জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সমান ভোটাধিকার থাকে। আর সেই গণতান্ত্রিক অধিকার সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য নির্বাচন কমিশন (ইসি) নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যার একটি ২০০৮ সালে প্রণীত নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা কিছুটা সংশোধিত ও পরিবর্ধিত আকারে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের আচরণ বিধিমালা-২০২৫ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন। ভোটার, প্রার্থী এবং সচেতন নাগরিক সকলেরই এ আইন জানা ও মানা অতীব জরুরি।

২০২৪ সালের জুলাই গণ-আন্দোলন পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর ইতোমধ্যে পার হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের চাওয়া এখন নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া। সে মোতাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দিয়েছেন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সময়সীমা অনুযায়ী দল এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রস্তুতি সেরে নিচ্ছে।

বিধিমালায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পোস্টারবিহীন ভোট গ্রহণ, পরিবেশবান্ধব প্রচারণা সামগ্রীর ব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার সুযোগ এবং বিধি লঙ্ঘনে দেড় লক্ষ টাকা জরিমানাসহ একগুচ্ছ পরিবর্তন এনে খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

বিধিমালায় প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম, একাউন্ট আইডি, ইমেইল আইডিসহ অন্যান্য শনাক্তকরণ তথ্যাদি নির্বাচন শুরুর পূর্বে রিটার্নিং অফিসারের নিকট দাখিল করে অনলাইনে প্রচারণা চালাবে। তবে ক্ষতিকর কন্টেন্ট যেমন ভুল তথ্য ও নির্বাচন সম্পর্কে বানোয়াট তথ্য, প্রতিপক্ষ ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক তথ্য এবং ধর্মীয় ও জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি হয় এমন তথ্য প্রচার করা যাবে না। এছাড়াও ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য যেমন পক্ষপাতমূলক কনটেন্ট, এডিট করা বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে নির্মিত ভিডিও, সত্যতা যাচাই (ফ্যাক্ট চেকিং) না করে নির্বাচন সম্পর্কে বানোয়াট তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করা যাবে না। আর নির্বাচনের নির্ধারিত তারিখের ৪৮ ঘন্টা পূর্বে থেকে অনলাইন প্রচারণা বন্ধ রাখতে হবে।

পোস্টার বলতে ২০০৮ সালের নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় কাগজ, রেক্সিন, ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমসহ অন্য যেকোনো মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত কোনো প্রচারপত্র, প্রচারচিত্র, বিজ্ঞাপনপত্র, বিজ্ঞাপনচিত্রন এবং যেকোনো ধরণের ব্যানার ও বিলবোর্ডও বুঝানো হতো। কিন্তু ২০২৫ সালের নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় সেই কাগুজে পোস্টার বাদ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং সহজে ধ্বংস হয়না এমন অপচনশীল কোনো উপাদান ব্যবহার করা যাবে না। প্রার্থী বা তার প্রতিনিধি দালান, দেওয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি বা অন্য কোনো দন্ডায়মান বস্তুতে; সরকারি বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্থাপনায়, কোনো যানবাহনে কোন প্রকার লিফলেট/হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন সাঁটাইতে পারবে না। তবে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয় এমন লিফলেট, ব্যানার বা হ্যান্ডবিল রশি দিয়ে ঝুলাইতে বা টাঙ্গাইতে পারবে। এছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রচারণা সামগ্রীর উপর নিজ প্রচারণা সামগ্রী সেট না করা, সাদা-কালো রঙের নির্ধারিত আকারের অনধিক ১০ ফুট বাই ০৪ ফুট ব্যানার, এ৪ সাইজ (৮ দশমিক ২৭ ইঞ্চি বাই ১১ দশমিক ৬৯ ইঞ্চি) লিফলেট, প্রচারণায় নিজ এবং দলীয় মনোনীত হলে দলীয়প্রধান ব্যতীত অন্য ছবি ব্যবহার না করা, নির্বাচনী প্রতীকের সাইজ অনধিক ৩ মিটার এবং কোনো প্রচার সামগ্রীতে পলিথিনের আবরণ ও প্লাস্টিক ব্যানার (পিভিসি) ব্যবহার না করার কথা বলা হয়েছে। এগুলো নির্বাচনী আচরণ বিধিমালার লঙ্ঘনের শামিল।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোটার স্লিপ ব্যবহার সংক্রান্ত বিধি যুক্ত করা হচ্ছে। প্রার্থী বা তার এজেন্ট ভোটকেন্দ্রের ১৮০ মিটারের বাইরে ভোটার স্লিপ প্রদান করতে পারবে যাতে ভোটারের নাম, ভোটার নম্বর ও কেন্দ্রের নাম উল্লেখ থাকবে। তবে কোনোভাবেই প্রার্থীর নাম ও ছবি, সংশ্লিষ্ট পদের নাম, প্রতীক ও ভোট প্রার্থনা করে ভোটার স্লিপে কিছু লিখা যাবে না এবং ১২ সেন্টিমিটার বাই ৮ সেন্টিমিটারের অধিক সাইজের স্লিপ ব্যবহার করা যাবে না।

প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকারনামা নতুনভাবে সংযোজিত করা হয়েছে নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা-২০২৫ এ। দল ও প্রার্থী উভয়ই একটা কমন প্লাটফর্মে একটা হলফ নামা দেবে যে, তারা এই আচরণ বিধিমালা মেনে চলবেন। কমন প্লটফর্ম বলতে- রিটার্নিং অফিসাররা সংশ্লিষ্ট আসনের সব ক’জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে নিয়ে একটি প্লাটফর্ম থেকে একদিনে তাদের ইশতেহার বা ঘোষণাপত্রগুলো পাঠ করার ব্যবস্থা করবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের আগে যেরূপ বিতর্ক ও টকশো আয়োজন হয়, বাংলাদেশেও বিভিন্ন টিভি মিডিয়াতে প্রার্থী বা তার মনোনীত ব্যক্তিকে সেরূপ ডায়লগে অংশগ্রহণ করার সম্মতি দেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনে আগে যে নরমাল শাস্তি ছিল ছয় মাস কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, এবার সেখানে জরিমানা সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকার প্রস্তাব করা রয়েছে।

আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে ১৯৭২ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) এর ধারা ৯১ (ঙ) তে প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়টি ইতোঃপূর্বে আচরণবিধিতে সন্নিবেশিত ছিল না, এটা সন্নিবেশ করা হচ্ছে। বিলবোর্ডের ব্যবহার অতীতে ছিল না, বর্তমানে অনধিক ১৬ ফুট বাই ৯ ফুট আকারের এবং নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে। আর সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তি বলতে পূর্বতন সংজ্ঞার সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারা প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে পারবে না। তাদের জন্য বিভিন্ন সরকারি সুবিধার ব্যবহার, যেমন- সার্কিট হাউস, ডাক বাংলো ও রেস্ট হাউস এ সবের ওপরে কিছু বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া ২০০৮ সালের নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় উল্লেখিত কোনো প্রার্থী বা তার এজেন্টের কোনো অনুষ্ঠানে চাঁদা ও অনুদান প্রদান নিষিদ্ধ, সরকারি ডাক-বাংলো, সার্কিট হাউজ ব্যবহার করে কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা না চালানো, সভা-সমিতি-অনুষ্ঠান করার পূর্বেই যথাযথ কতৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া, যানবাহন ব্যবহার করে শোডাউন না করা এবং বিধি-নিষেধ মেনে চলা, কোনো প্রার্থীর মনোনয়ন দাখিলে বাধা প্রদান না করা, দেওয়াল লিখন ও রোড ডিভাইডারে লিখে প্রচারণা না করা, প্রতীক হিসেবে জীবন্ত প্রাণী ব্যবহার না করা; গেইট, তোরণ, পেন্ডেল, ক্যাম্প স্থাপনে বিধি মেনে চলা, উস্কানিমূলক বক্তব্য বা বিবৃতি প্রদান থেকে বিরত থাকা, প্রচারের নির্ধারিত সময় দুপুর ২.০০টা থেকে রাত ৮.০০টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ০৩টি মাইক ব্যবহার করা, ভোটগ্রহণ সমাপ্তির পরবর্তী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে প্রচারণা সামগ্রী অপসারণ এবং নির্বাচনী ব্যয়সীমা সংক্রান্ত বিধি-নিষেধ ২০২৫ সালের সংশোধিত রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালাতেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার এবং নির্বাচন কমিশন (ইসি) দেশে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনে বদ্ধপরিকর। জনগণের মৌলিক অধিকার ভোটাধিকার প্রয়োগে যাতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে, সে লক্ষ্যে সব ধরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং সাধারণ জনগণের উচিৎ নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলা এবং ভোটাররা ভোটগ্রহণের দিন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেওয়া। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ও অংশগ্রহণমূলক ভোট প্রদানই আগামীর বাংলাদেশের কর্ণধার বাছাইয়ের একমাত্র উপায়।

লেখকঃ বিসিএস (তথ্য) ক্যাডার অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস (পিআইডি), ময়মনসিংহ।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *