স্টাফ রিপোর্টার, বিএমটিভি নিউজঃ
ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে রেললাইন উপরে ফেলায় অগ্নিবীণা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনসহ দুই বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এতে ভোর ৫ থেকে সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত মোট ১৪ ঘন্টা ঢাকা-ময়মনসিংহ ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। এদিকে, মনোনয়ন দ্বন্ধে তৃতীয় দিনের মত আন্দোলনে দুই পক্ষের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একই সাথে রেলওয়ে স্টেশন ভাংচুর করেছে বিক্ষোব্ধ জনতা। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় দু’জন আহত হয়েছে। এছাড়া মানুষের মাঝে আতঙ্কে গফরগাঁও পৌর শহরে তিন দিন সকল ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে ব্যবসায়ীরা। ট্রেন যোগাযোগ বন্ধের সাথে সাথে বাস যোগাযোগ সম্পুর্ণ বন্ধ রয়েছে। এতে কার্যত গফরগাঁও সম্পুর্ন অচল হয়ে পড়েছে।
সোমবার (২৯ ডিসেস্বর) ভোর ৫টা ১০ মিনিটের দিকে গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশনের ২ কিলোমিটার আগে সালটিয়া মাঠখোলা এলাকায় ২০ ফুটের মত রেললাইন উপরে ফেলে দুবৃত্তরা। তারাকান্দি থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিনসহ দুটি বগব লাইনচ্যুত হয়ে যায়। এতে ট্রেনের যাত্রীরা আকঙ্কে তাড়াহুড়া করে ট্রেন থেকে নেমে আসে। রেলপথ লাইনচ্যুত হওয়ায় ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে ঢাকা থেকে উদ্ধারকারী ট্রেন এসে বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে উদ্ধার কাজ সম্পন্য করে। তবে, ট্রেন চলাচল এখনো শুরু হয়নি। রাত ৭ টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে কখন ট্রেন চলবে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আক্তার হোসেন।
তিনি বলেন, ভোরে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার পর বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে উদ্ধার কাজ সম্পন্য হয়েছে রেললাইনে আরও কোন ক্রটি আছে কিনা তা দেখা হচ্ছে। পরে রাত ৭ টার পর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত নিবেন, কখন ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল সচল।
এদিকে, জামালপুর থেকে ঢাকাগামী যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেন সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ময়মনসিংহ স্টেশনে এসে অস্থায়ীভাবে থেমে যায়। ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ বন্ধ থাকায় বিকল্প রুট হিসেবে গৌরীপুর, কিশোরগঞ্জ ও ভৈরব হয়ে ঢাকা যাত্রা করে ট্রেনটি।
ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন সুপার আবদুল্লাহ আল হারুন জানান, বিকল্প হিসেবে ভৈরব রুটে ঢাকাগামী যমুনা এক্সপ্রেস ছেড়ে গেছে। এ ছাড়া ঢাকা থেকে জামালপুর এক্সপ্রেস ও মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন ভৈরব হয়ে ময়মনসিংহে আসবে।

চার ট্রেনের যাত্রা বাতিল
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ বন্ধ থাকায় নিম্নলিখিত ট্রেনগুলোর যাত্রা বাতিল করা হয়েছে, ঢাকা-তারাকান্দি রুটের আন্তনগর অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস, তারাকান্দি-ঢাকা রুটের আন্তনগর অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস, দেওয়ানগঞ্জ বাজার-ঢাকা রুটের আন্তনগর ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস ও নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ-ঢাকা রুটের আন্তনগর হাওর এক্সপ্রেস। টিকিটের মূল্য ফেরত পেতে অনলাইনে লগইন করে রিফান্ড গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ময়মনসিংহের ইনচার্জ মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে অনিবার্য কারণে ট্রেনগুলোর যাত্রা বাতিল করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার সময় ট্রেনের গতি ছিল ২০ কিলোমিটার
দুর্ঘটনার সময় আন্তঃনগর অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনের গতিসীমা ২০ কিলোমিটারে ছিল। তাই বড় ধরনের কোন ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছেন চালক আব্দুল হালিম।
তিনি বলেন, আউটার সিগনালে ঝুঁকি থাকায় ট্রেনটি সেখানেই থামানোর কথা ছিল। থামানোর ১০০ গজ পূর্বেই সেই দূর্ঘটনা ঘটে। বিকট শব্দে পড়ে যায় ট্রেনের ইঞ্জিনসহ দুইটি বগি। পরে নেমে দেখি ২০ মিটার রেললাইনের পাত অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়েছে।
ট্রেনটির সহকারী চালক হাসিম উদ্দিন বলেন, কুয়াশার কারণে ট্রেনের গতি ছিল ৫০ কিলোমিটার। স্টেশনের আগে আউটার সিগনাল ঝুঁকি থাকায় সেখানে ট্রেনটি থামানোর কথা ছিল। যার কারণে গতিসীমা ২০ কিলোমিটারে নিয়ে আসা হয়। ২০ কিলোমিটার গতি থাকা অবস্থায় দূর্ঘটনা হওয়ায় তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
কারণ অনুসন্ধানে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন
রেললাইন উপরে ফেলার ঘটনায় ৫ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিভাগীয় প্রকৌশলী সিরাজ উদৌল্লা তদন্ত কমিটি গঠন করার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আগামী তিন কার্য দিবসের মাঝে তদন্ত কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে প্রাপ্ত দোষীদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।
ট্রেন দুর্ঘটনায় যা বলছে স্থানীয়রা
স্থানীয় আশরাফুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার সময় বিকট শব্দ হয়। তখন বাসা থেকে উঠে দেখি যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে নামছে। এমন কাজ করা মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়। আরো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো। যারা রেললাইন উপরে ফেলেছে তারা দেশের শত্রু। তাদেরকে সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক।
রফিকুল ইসলাম নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, বিএনপির মনোনয়নকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা চলছে। সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে আওয়ামী দোসরা এমন কাজ করে থাকতে পারে। বিএনপির পক্ষে এ কাজ করা কোনভাবেই সম্ভব নয়।
রেলওয়ে স্টেশনে ভাংচুর, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া
আন্দোলনের তৃতীয দিনে সোমবার দুপুরে মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের অনুসারীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে গফরগাঁও রেলস্টেশন প্রবেশ করে টিকেট কাউন্টার ভাংচুর করে। এসময় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর অনুসারীরা তাদেরকে ধাওয়া করলে উভয়ের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে রবিউল ও মকবুল নামের দুইজন আহত হয়। আহতদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।
এদিকে, তৃতীয় দিনে বিক্ষোভ অবরোধের মুখে গফরগাঁও অচল অবস্থায় রয়েছে। বাস ও ট্রেন চলাচল বন্ধ। পৌর শহরসহ আশপাশের এলাকায় ব্যবসায়ীরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছেন। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
মনোনয়ন দ্বন্ধে আন্দোলনে প্রখম ও দ্বিতীয় দিন
গত শনিবার মুপুরে ময়মনসিংহ-১০ গফরগাঁও আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পান আক্তারুজ্জামান বাচ্চু। এরপর বিষয়টি জানাজানি হলে মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের কর্মীরা আন্দোলন শুরু করেন।
মনোনয়ন ঘোষণার পর শনিবার বিকাল ৩ টা থেকে বঞ্চিত নেতা এবি সিদ্দিকুর রহমান ও মুশফিকুর রহমানের অনুসারীরা আন্দেলন শুরু করেন। এতে ট্রেন ও গণপরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম দিনও রেললাইনসহ গফরগাঁও পৌর শহরসহ আশপাশের এলাকায় অন্তত ১০ পয়েন্ট অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষোভকারিরা। পরে রাত সাড়ে ১১ টার দিকে বিক্ষোভকারিরা রেললাইন থেকে সরে আসে।
একই দিনে স্টেশনের কম্পিউটার সিস্টেম, সিগনাল লাইট, স্টেশনে সংযোগ লাইনের বক্সে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। স্লিপার তুলে নেয়ায় সরে গেছে রেললাইন। এতে বিকাল ৩ টা থেকে রাত সাড়ে ১১ টা পর্যন্ত পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ থাকে।
বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে গত রবিবার বঞ্চিত প্রার্থীদের সমর্থকরা দ্বিতীয় দিনে ব্যাপক আন্দোলন করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ও জনগনের জান-মাল রক্ষায় গুলি করার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। একই সাথে বিকালে গফরগাঁও জলকামান নেয়া হয়। এদিকে, ওই দিন চার বার ট্রেন অবরোধ করে। এতে ওই দিন ৬ ঘন্টার বেশি সময় ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। এদিন রেললাইনসহ গফরগাঁও পৌর শহরসহ আশপাশের এলাকায় অন্তত ৩০ পয়েন্ট অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষোভকারিরা। এমন পরিস্থিতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে গুলির নির্দেশ দেয় ও জলকামান প্রস্তুত রাখে।
যা বলছে প্রশাসন
গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশন সুপার হানিফ বলেন, বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে ট্রেনের উদ্ধার কাজ সম্পন্য হয়েছে। রেললাইনে আরও ক্রুটি আছে কিনা তা দেখা হচ্ছে। ট্রেন চলাচন কখন থেকে স্বাভাবিক হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। জনগসের জান-রক্ষায় এখনো ট্রেন চলাচলের কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।
গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এনএম আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন হওয়ায় উপজেলা পরিষদসহ আশপাশে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। ভোরে রেলপথের একটি অংশের পাত খুলে ফেললেও কোনো হতাহত হয়নি। পৌর শহরের বিভিন্ন স্থানে সড়কে ছোটখাটো প্রতিবন্ধকতা করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তবে তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আশা করছি, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ হয়ে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ( অর্থ ও প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘উপজেলা শহরে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে কোনো ঝামেলা যেন না হয়, সে দিকে আমরা তৎপর রয়েছি। তবে, গফরগাঁওয়ের পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
প্রসঙ্গত গত শনিবার দুপুরে ময়মনসিংহ-১০ গফরগাঁও আসনে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন পান আক্তারুজ্জামান বাচ্চু। এরপর বিষয়টি জানাজানি হলে মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের কর্মীরা আন্দোলন শুরু করেন। এরপর থেকে রেললাইন অবরোধ ও অগ্নি সংযোগ করে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।
এনায়েতুর রহমান