
You must need to login..!
Description
আতাউর রহমান জুয়েল, ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের যেন ভোগান্তির শেষ নেই। হাসপাতালের বারান্দায় ও সিঁড়িতে চিকিৎসা দেওয়া, সরকারি ওষুধ না পাওয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানো, অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট ও চিকিৎসকদের কমিশন বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব কারণে সঠিক চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে বিপাকে রয়েছেন রোগীরা। এ নিয়ে ছয় পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের তৃতীয় পর্বে থাকছে কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারের নিম্নমানের মেশিন দিয়ে একই রোগের পরীক্ষায় রোগীদের দুই ধরনের রিপোর্ট দেওয়ার ভোগান্তির চিত্র।
রোগীরা বলছেন, হাসপাতালে একই রোগের পরীক্ষায় রোগীদের দেওয়া হচ্ছে দুই ধরনের রিপোর্ট। এতে রোগীর সঠিক চিকিৎসা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্বজনরা। আবার রোগীর পরীক্ষার ভুল বা অনুমাননির্ভর রিপোর্ট দেওয়ায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানালেন চিকিৎসকরা। হাসপাতালে কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারের নিম্নমানের মেশিন ব্যবহার করায় এমন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৯ সালে চীন থেকে একটি নিম্নমানের মেশিন এনে হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে সরবরাহ করেছিল মেসার্স বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ওমর ফারুক। এতে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয় এবং রোগীদের পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়ে। এরপর তদন্তে সত্যতা পাওয়ায় বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সকে কালো তালিকাভুক্ত করে মেশিনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পরে বিসমিল্লাহ ট্রেডার্সের নাম বদলে ‘মেসার্স অলিভ বাংলাদেশ’ নাম নিয়ে আবারও হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহের জন্য আসেন ওমর ফারুক। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. গোলাম ফেরদৌস হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে ২০২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি কাজে যোগ দেন। এরপর কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদার ওমর ফারুক কৌশলে পরিচালকের সঙ্গে গত বছরের এপ্রিল মাসে দেখা করেন। আবারও হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহের কাজে নিয়োজিত হন। চীন থেকে তার আনা নিম্নমানের বেশ কিছু মেশিন ওয়ান স্টপ সার্ভিস, আউটডোর প্যাথলজি ল্যাব ও সিসিইউ ল্যাবে সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে ওয়ান স্টপ সার্ভিসে রয়েছে ইলেকট্রোলাইট এনালাইজার সিবিএস ৩০০, হিমেক্স অটো হেমাটোলজি এনালাইজার থ্রি পার্ট (সিবিসি), বায়ো সায়েন্স হরমোন এনালাইজার ম্যানুয়েল ও মিট ফিউচার বিকে ২০০ অটো বায়োকেমিস্ট্রি এনালাইজার মেশিন। আউটডোর প্যাথলজি ল্যাবে ব্যবহার হচ্ছে মিট ফিউচার বিকে ৫০০ অটো বায়োকেমিস্ট্রি এনালাইজার ও ইলেকট্রোলাইট এনালাইজার ৩০০ মেশিন। এ ছাড়া সিসিইউ ল্যাবে ব্যবহার হচ্ছে ইলেকট্রোলাইট এনালাইজার সিবিএস ৩০০, হিমেক্স অটো হেমাটোলজি এনালাইজার থ্রি পার্ট (সিবিসি), জিসেন হরমোন এনালাইজার ম্যানুয়েল, বায়ো সাইন্স হরমোন এনালাইজার ম্যানুয়াল, ল্যানসনবায়ো হরমোন এনালাইজার ম্যানুয়েল, পকলিয়া হরমোহাসপাতালের দুজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আগের ভালো মেশিনগুলোকে বাদ দিয়ে নিম্নমানের এসব মেশিন ব্যবহার শুরু করা হয়। ওমর ফারুকের দেওয়া এসব মেশিন বাজারের একেবারে নিম্নমানের ও কম দামের রিএজেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কারণে এসব মেশিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ওলট-পালট ফলাফল আসছে। রোগীদের এসব মেশিনে পরীক্ষার পর দ্বিতীয়বার অন্য ল্যাব থেকে পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এতে রোগীদের দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
হাসপাতালের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে স্ট্রোক করে ভর্তি হন নেত্রকোনার নুরুল ইসলাম। ওয়ান স্টপ সার্ভিসে গত ১৫ নভেম্বর তার লিপিড প্রোফাইল প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা করানো হয়। রিপোর্টে ইলেকট্রোলাইটের পটাশিয়াম দেখায় ৬ দশমিক ৮৮, তবে নরমাল হচ্ছে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৫, সোডিয়ামে আসে ১৩১ দশমিক ৭, তবে নরমাল হচ্ছে ১৩৫-১৪৫ পর্যন্ত ও ক্লোরাইড আসে ১০৪ দশমিক ২, তবে নরমাল হচ্ছে সর্বোচ্চ ১০৮ এমএমওএল। এই রিপোর্ট দেখার পর চিকিৎসক বলেছেন, অ্যাবনরমালিটি। সেইসঙ্গে রোগীকে আবার অন্য প্যাথলজি ল্যাব থেকে ইলেকট্রোলাইট পরীক্ষা করাতে বলেন চিকিৎসক।
পরে নুরুল ইসলামের ব্লাডের ইলেকট্রোলাইট পরীক্ষা করাতে দেওয়া হয় হাসপাতালের ইনডোর প্যাথলজি ল্যাবে। এখানে রিপোর্ট আসে পটাশিয়ামে ৪ দশমিক ৪, তবে নরমাল হচ্ছে ৫ দশমিক ৫, সোডিয়ামে আসে ১২৯ দশমিক ৬, তবে নরমাল হচ্ছে ১৩৫-১৪৫ পর্যন্ত ও ক্লোরাইড আসে ৯৯ দশমিক ১, তবে নরমাল হচ্ছে সর্বোচ্চ ১০৮ এমএমওএল। এই রিপোর্ট চিকিৎসককে দেখানোর পর চিকিৎসা দেওয়া হয়। চিকিৎসক রোগীর স্বজনকে জানান, আগের ওয়ান স্টপ সার্ভিসের রিপোর্টে সমস্যা ছিল। এজন্য দ্বিতীয়বার করতে হলো।
এ ব্যাপারে রোগীর স্বজন কামাল হোসেন বলেন, ‘এমনিতেই বয়স্ক মানুষ। তার ওপর স্ট্রোক করে গুরুতর অবস্থা হয়ে গেছে। এর মধ্যে একই পরীক্ষার জন্য বারবার রক্ত নেওয়াটা খুবই কষ্টকর। হাসপাতালের প্যাথলজি ল্যাবের দুই মেশিনে দুই রকম রিপোর্ট এসেছে। খরচও দ্বিগুণ নিয়েছে। এটি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা। এগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দায়িত্বশীলদের কাছে অনুরোধ জানাই।’
মেডিসিন বিভাগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের এক রোগীর স্বজন রফিক মিয়া বলেন, ‘আমার মায়ের পেটব্যথা ও কিডনি সমস্যা নিয়ে হাসপাতালের ভর্তি করেছি। বেশ কিছু প্যাথলিজক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়া হয়। ওয়ান স্টপ সার্ভিস থেকে পরীক্ষা করানোর পর ওই রিপোর্ট সঠিক নয় বলে জানান টিকিৎসক। আবারও পরীক্ষা করাতে বলেন। পরে বাইরের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে পরীক্ষা করাই। সেখানের রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক মাকে চিকিৎসা দিয়েছেন। তবে দুবার পরীক্ষা করাতে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচের পাশাপাশি ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে আমাদের। হাসপাতালের ল্যাবে নিম্নমানের মেশিন ব্যবহার করায় এমন ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে রোগীদের। প্রতিদিনই রোগীরা একই সমস্যা নিয়ে প্রাইভেট ল্যাবে যাচ্ছেন।’
প্যাথলজি ল্যাবের কর্মরত-কর্মচারীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নিম্নমানের মেশিনে নিম্নমানের রিএজেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কারণে প্রায়ই সব রিপোর্ট অ্যাবনরমালিটি আসছে। একই রোগের পরীক্ষা দুবার করাতে হচ্ছে রোগীদের। ওমর ফারুকের মেশিন চালু করার পর থেকেই এই সমস্যা চলছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাসপাতালের ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট ডা. খেলেদ মোশারফ হোসেন বলেন, ‘অলিভ বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী ওমর ফারুকের দেওয়া বেশ কিছু মেশিন ওয়ান স্টপ সার্ভিস, আউটডোর ও সিসিইউ প্যাথলজি ল্যাবে ব্যবহার হচ্ছে। তার থেকেই মেশিনের জন্য রিএজেন্ট নেওয়া হচ্ছে। তবে রিএজেন্ট নিম্নমানের কিনা, সেটি আমার জানা নেই।’
এদিকে ২০১৮ সালে বিসমিল্লাহে টেডার্সের ঠিকাদার ওমর ফারুকের দেওয়া কোটি টাকার অটো-বায়োকেমিস্ট্রি মেশিনটি এখনও চালু করা হয়নি। সিসিইউ প্যাথলজি ল্যাবে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে সেটি। এরপরও কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদার ওমর ফারুক যন্ত্রপাতি সরবরাহের কাজ পাওয়ায় এবং নিম্নমানের মেশিনসহ রিএজেন্ট ব্যবহার করায় চিকিৎসক-নার্সদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারের নিম্নমানের মেশিন কেন ব্যবহার করা হচ্ছে জানতে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. গোলাম ফেরদৌসকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।
তবে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন খান বলেন, ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস ও সিসিইউ ল্যাব বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত। সব ল্যাবে যে ঠিকাদারের মেশিন ব্যবহার হচ্ছে, তার কাছ থেকেই রিএজেন্ট নেওয়া হচ্ছে। তবে নিম্নমানের রিএজেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা, বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’