ময়মনসিংহ মেডিক্যাল হাসপাতালে বিছানার তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেশি

image

You must need to login..!

Description

আতাউর রহমান জুয়েল, ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সরকারি ওষুধ না দেওয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠানো ও চিকিৎসকদের কমিশন বাণিজ্যসহ নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। এসব কারণে চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে বিপাকে রয়েছেন রোগীরা। ওয়ার্ডের শয্যায় জায়গা না পাওয়ায় বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছেন রোগীরা। সেখানেও পা ফেলার জায়গা নেই। কেউ কেউ সিঁড়ির কোণে, আবার কেউ ওয়াশরুমের পাশে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে বর্তমানে রোগী ভর্তি আছেন তিন হাজার ৬০০ জন। যা বিছানার তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেশি। একসঙ্গে এত রোগী সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে এ দৃশ্য দেখা গেছে। তবে এটি নিত্যদিনের ঘটনা।হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এক হাজার শয্যার জনবল দিয়েই চলছে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম। ৪৭৪ চিকিৎসকের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩৯০ জন। শূন্য পদের সংখ্যা ৮৪। অর্থাৎ ৮৪ জন চিকিৎসক নেই। আউটডোরে ২৫ চিকিৎসকের বিপরীতে ২৫ জন আছেন। জরুরি বিভাগে ১২ পদের বিপরীতে মেডিক্যাল অফিসার আছেন ১১ জন। এক হাজার ৯৩ সিনিয়র স্টাফ নার্সের বিপরীতে আছেন এক হাজার ৪৭ জন। শূন্য পদ আছে ৪৬টি। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ২৪২ জনের বিপরীতে আছেন ১৬৭ জন এবং চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ৪৬১ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২২৩ জন।
১৭ ডিসেম্বর হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিলেন তিন হাজার ২০৫ জন। হিসাবে শয্যার বিপরীতে তিন গুণ রোগী বেশি চিকিৎসা নিচ্ছেন। এদিন মেডিসিন বিভাগে ১৭০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি ছিলেন ৭৯১, সার্জারি বিভাগে ১৫০ শয্যার বিপরীতে ৪০১, অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগে ৬৫ শয্যার বিপরীতে ২২৬, শিশু বিভাগে ৬০ শয্যার বিপরীতে ২৮০, গাইনি বিভাগে ১২০ শয্যার বিপরীতে ৩১০, সিসিইউতে ৫০ শয্যার বিপরীতে ১৮০, নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) ৫০ শয্যার বিপরীতে চিকিৎসা নিচ্ছে ১৫০ জন। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এটি এক হাজার শয্যার হাসপাতাল। এর বিপরীতে কম জনবল দিয়ে কার্যক্রম চলছে। ইনডোর ছাড়াও প্রতিদিন হাসপাতালের আউটডোরে তিন হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসাসেবা নেন। তবে শয্যার জনবল কাঠামো অনুযায়ী লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এখানে ময়মনসিংহ বিভাগের জেলাগুলো ছাড়াও গাজীপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, রংপুর ও কুড়িগ্রাম থেকেও রোগীরা আসছেন। শয্যার তুলনায় প্রায় তিনগুণ রোগীর চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা।

১৭ ডিসেম্বর মেডিসিন বিভাগের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে ২৪ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি ছিলেন ১৫০ জন। বিছানায় ঠাঁই না পেয়ে মেঝেতে, বারান্দায় এমনকি সিঁড়ির কোণে বিছানা পেতে রোগীদের চিকিৎসা নিতে দেখা যায়।

‘ওয়ার্ডের ভেতরে দূরে থাক, বারান্দায় জায়গা না পেয়ে সিঁড়ির কোণে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। দিনরাত মানুষ যাওয়ার পথে পা দিয়ে ধাক্কা মারছে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কী করমু হাসপাতালে ভর্তির পর ওয়ার্ডের ভেতরে একটা বিছানা পাওয়াটা যেন সোনার হরিণ।’

পেটের ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে এসব কথা বলেছেন হাসপাতালের ৭ নম্বর সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি নেত্রকোনার মদন উপজেলার কেটজানি গ্রামের মুদি দোকানি মিনারুল ইসলাম (২৭)। আলসার ও পিত্তথলিতে পাথর হওয়ায় গত ২০ নভেম্বর রাতে এখানে ভর্তি হন। ওয়ার্ডে কিংবা বারান্দার আশপাশে জায়গা না পেয়ে হাসপাতালের দোতলার সিঁড়ির কোণে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

মিনারুল বলেন, ‘আমার মতো আরও শত শত রোগী অনেক কষ্ট করে এভাবে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে ওয়ার্ড থেকে দূরে থাকায় সময়মতো চিকিৎসক ও নার্সদের দেখা পাওয়া যায় না।’

শুধু মিনারুল নন, হাসপাতালের বিছানার বিপরীতে প্রায় সাড়ে গুণ রোগী ভর্তি থাকায় মেঝে কিংবা বারান্দায় জায়গা না পেয়ে শত শত রোগী সিঁড়িতে বিছানা পেতে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। তাদেরই একজন ত্রিশালের হরিরামপুর এলাকার ফরাজ উদ্দিন।

তিন বলেন, ‘পেটের ব্যথা নিয়ে ২২ নভেম্বর ১৪ নম্বর মেডিসিন ওয়ার্ডের ২ নম্বর ইউনিটে ভর্তি হয়েছি। ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে টয়লেটের কাছে বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছি। ওয়ার্ড থেকে দূরে থাকায় চিকিৎসক-নার্স এসে আমাকে খুঁজে পান না। এ কারণে চিকিৎসক-নার্সকে প্রতিদিন ডেকে আনতে হয়। তবে চিকিৎসক-নার্সরা আন্তরিকভাবেই চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন আমাদের।’
বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা নেওয়া আরেক রোগীর স্বজন দিদার হোসেন বলেন, ‘হাসপাতালে প্রচুর রোগী। কোথাও জায়গা নেই। রোগীর সঙ্গে স্বজন থাকেন কয়েকজন করেন। তারাও হাসপাতালেই থাকেন। এ কারণে রোগীদের চাপ বেশি থাকে। চাপ সামলাতে চিকিৎসক-নার্স ও কর্মচারীদের হিমশিম খেতে হয়। এ অবস্থায় হাসপাতালে বিছানার সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।’

এ বিষয়ে মেডিসিন বিভাগের ২ নম্বর ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক ডা. খুরশেদুল আলম বলেন, ‘এক হাজার শয্যার হাসপাতাল এটি। প্রতিদিন গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। মেডিসিন বিভাগে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। এই ওয়ার্ডে ২৪ বিছানার বিপরীতে দুই শতাধিক রোগী ভর্তি আছেন। সব রোগীকে প্রতিদিন দেখতে হয়। তবে কর্মরত চিকিৎসক-নার্স এবং কর্মচারীরা তাদের সাধ্যমতো সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বিনা চিকিৎসায় কেউ যাতে বাড়ি ফিরে না যায়।’

শয্যা না পাওয়ার প্রধান কারণ অতিরিক্ত রোগী এমনটি জানিয়েছেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ও ফোকাল পারসন ডা. মাইন উদ্দিন খান। তিনি বলেন, ‘ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রতিদিন চার গুণ রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অতিরিক্ত রোগী থাকায় তাদের জন্য ওয়ার্ডে বিছানার ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। তবে সব রোগীকে বিনামূল্যে ওষুধসহ খাবার দেওয়া হয়। স্বল্প খরচে রোগীরা হাসপাতালে সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে পারছেন।’

শয্যা সংকট কীভাবে কাটবে জানতে চাইলে ডা. মাইন উদ্দিন খান বলেন, ‘বেশ কয়েকটি ভবনের কাজ চলমান আছে। সেগুলোর কাজ শেষ হলে রোগীদের বিছানার সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে।’

প্রধান সম্পাদকঃ
মতিউল আলম

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ
মাকসুদা আক্তার