গণভোট ও আগামীর বাংলাদেশ

গণভোট ও আগামীর বাংলাদেশ

BMTV Desk No Comments

মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান

মেধার মূল্যায়ন পেতে ২০২৪ সালে ছাত্রজনতা দেশব্যাপী আন্দোলনে নামে। সে আন্দোলন পরে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন আন্দোলনে পরিণত হয়। জুলাই মাস ৩৬ দিনে রূপান্তরিত হয়। সহস্রাধিক ছাত্রজনতা শহীদ হন এবং কয়েক হাজার হতাহত হন। দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে যুগান্তকারী পরিবর্তনের প্রত্যাশা জাগে জনগণের মধ্যে যাতে কোনো সরকার ভবিষতে আর ফ্যাসিস্ট হতে না পারে। ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ ঠেকাতে এবং উন্নত গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে জুলাই সনদ রচিত এবং তার উপর জনসমর্থন যাচাই করতেই গণভোটের আয়োজন।

আপনারা অবগত আছেন যে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারীতে একই দিনে গণভোট ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

দেশের চাবি আপনার হাতে। দেশের চাবি আমার হাতে। দেশের চাবি আমাদের হাতে। তাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে আমাদের সুচিন্তিত সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে।

২৮টি সংস্কার প্রস্তাবের উপর দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্যমত্য হয়েছে। এ বিষয়গুলোর উপর জনমত যাচাই করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গণভোটের আয়োজন করছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এ বিষয়ে ঐক্যমত্য হলেও দেশতো জনগণের। তাই জনগণের মতামতও নেওয়া দরকার বলে তারা অনুধাবন করেছে।

গণভোটে যে বিষয়গুলো নিয়ে জনগণের মতামত চাওয়া হচ্ছে তার কিছু অনুচ্ছেদ নিচে দেওয়া হলো-

আপনি কি এমন বাংলাদেশ দেখতে চান-

১. যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন বা পিএসসি গঠনে সরকারি দল ও বিরোধী দল একত্রে কাজ করবে?

অতীতে এ ব্যবস্থাগুলো ক্ষমতাসীন দল নিজেদের খেয়াল খুশিমতো নিজেদের লোক দিয়ে গঠন করতো। দেশের জনগণ চায় এগুলো সকলের মতামতের ভিত্তিতে যোগ্য ও নিরপেক্ষ লোকের সমন্বয়ে গঠন করা হোক। তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করা সম্ভব হবে। পিএসসি যোগ্য ও নিরপেক্ষ লোকের সমন্বয়ে গঠিত হলে মেধাবী ছেলেরা চাকরি পাবে, তারা চাকরির অভাবে দেশ ছেড়ে যাবে না। বিগত সময়ে দলীয় বিবেচনায় পিএসসির সদস্য নিয়োগ দিয়ে দলীয় ছেলেপেলেদের চাকরি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আমরা চাই কোটামুক্ত বাংলাদেশ ও মেধাযুক্ত বাংলাদেশ।

২.আপনি কি এমন বাংলাদেশ গঠন চান যেখানে, সরকারি দল ইচ্ছে ও খেয়াল খুশি মতো সংবিধান সংশোধন করতে পারবে না?

বিগত সময়ে সংবিধানের যে কয়টি সংশোধন হয়েছে তার অধিকাংশ ক্ষমতাসীন দল নিজেদের সুবিধার জন্য করেছে এমনকি এতে জনমত যাচাই করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে সংশোধনীগুলো জনআকাঙ্খা পূরণ করেনি। দেশের সংবিধান পরিবর্তন হবে আর জনমত যাচাই করা হবেনা এটা গণতন্ত্রবিরুদ্ধ। সুতরাং সরকার চায় এমন একটা আইন প্রয়োগে পরবর্তী সরকার বাধ্য থাকুক যে, সংবিধান পরিবর্তন করতে হলে জনমত যাচাই করতে হবে।

৩. আপনি কি চান সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোটের বিধান চালু হোক? রাজনৈতিক দলের বাইরে সাধারণ জনগণের মতামতও নেওয়া হোক?

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সংযুক্তি ছিল সংবিধান সংশোধনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী অধ্যায়। সকল দলের মতামত ও জনআকাঙ্খা পূরণকল্পে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কিন্তু বাতিলের সময় কাউকে কেয়ার করা হয়নি। তাই আগামী দিনগুলোতে যাতে কোনো সরকার ইচ্ছে মতো সংবিধানের পরিবর্তন করতে না পারে এ জন্য গণভোটের বিধান করার জন্য সরকার আগামী গণভোটে মতামত প্রার্থনা করছে।

৪. আপনি কি ভবিষ্যতে এমন বাংলাদেশ দেখতে চান যেখানে, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটিসমূহের সভাপতি নির্বাচিত হবেন?

আপনারা লক্ষ্য করে দেখেছেন যে, যে সরকার ক্ষমতায় আসে সে সরকার পুরো দেশকেই নিজেদের মনে করে অথচ তারা মোট ভোটের চল্লিশ ভাগও পায় না। বিরোধী দলে থাকে ষাট ভাগ ভোটারের জনপ্রতিনিধি। কিন্তু তাদের তোয়াক্কাই করা হয় না। এটা সুষ্ঠু গণতন্ত্রের প্রতিফলন নয় বলে জনগণ মনে করছেন। তাই জুলাই সনদে এই অনুচ্ছেদ রাখা হয়েছে।

৫. আপনি কি এমন বাংলাদেশ চান যে, যত মেয়াদই হোক, কোন ব্যক্তি সব মিলে সর্বোচ্চ ১০ বছরে বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না?

বিগত হাসিনা সরকার রাতের ভোটে এবং ভোটহীন নির্বাচনের প্রধানমন্ত্রী হয়ে এমন উদ্ধত বক্তব্যও দিয়েছেন যে, “বিকল্প কে?” তার ধারণা জন্মেছে যে, বাংলাদেশে তিনি ছাড়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য আর কোনো লোক নেই। এটা চরম ক্ষমতা ও ফ্যাসিবাদী শাসকের আচরণ। তাই জনগণের চাহিদা অনুযায়ী জুলাই সনদে অনুচ্ছেদ রাখা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি দশ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। উন্নত সকল দেশেই এ নিয়ম রয়েছে। এই আইন থাকলে কেউ আর আজীবন প্রধানমন্ত্রী থাকার খায়েস করতে পারবে না। বাধ্য হয়েই তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে।

৬. আপনি কি চান সংসদের নারীর প্রতিনিধিত্ব পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পাক?

জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হলেও সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব খুবই কম। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের অধিকহারে সামনে নিয়ে আসবে এমন আশা করা যায় না। তাই নারীর অধিকার, কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নে পর্যায়ক্রমে সংসদে প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির বিষয়ে জনমত যাচাই করতে গণভোটে বিষয়টা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

৭. আপনি কি এমন বাংলাদেশ চান যেখানে, ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য পার্লামেন্টে একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে?

পৃথিবীর উন্নত সকল দেশেই সংসদের দুটো কক্ষ রয়েছে – উচ্চ কক্ষ ও নিম্ন কক্ষ। আমেরিকা, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ইত্যাদি সকল দেশেই দুটো কক্ষ রয়েছে। নিম্নকক্ষে সংসদ সদস্যগণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। আর উচ্চ কক্ষে সংসদ সদস্যের সংখ্যানুপাতে হন। এর ফলে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে ক্ষমতার ব্যালেন্স তৈরি হয়। বাংলাদেশেও উচ্চ-কক্ষ চালুর বিষয়টা গণভোটে আনা হয়েছে।

৮ আপনি কি চান দেশের বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করুক?

বিচার বিভাগ পরাধীন থাকলে জাতির কী ক্ষতি হয় তা বিগত পনের বছরে দেখা গেছে। সচিবালয় আর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বিচারালয়ে প্রেসক্রিপশন যেতো বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। ফলে বিচারের বাণী নিভৃতে কেঁদেছে। একজন প্রধান বিচারপতিকে দেশছাড়াও হতে হয়েছে। শাসকগোষ্ঠী যাতে বিচার বিভাগে এমন নগ্ন হস্তক্ষেপ করতে না পারে তারই বিধান করতে গণভোটে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

৯. আপনি কি চান আপনার মৌলিক অধিকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ুক?

বাংলাদেশের সংবিধানে ১৮টি মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, যা সংবিধানের তৃতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ২৬ থেকে ৪৭ (ক)) বর্ণিত আছে, যার মধ্যে আইনের চোখে সমতা, চলাফেরার স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধিকারগুলো অন্তর্ভুক্ত। সময়ের পরিবর্তনে মৌলিক অধিকারের প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। যেমন, ইন্টারনেট সেবা কখনো বন্ধ করা যাবে না। জুলাই আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে জাতির সাথে কেমন তামাশা করা হয়েছে তা আমরা কমবেশি সবাই অবগত। ইন্টারনেট ছাড়া বর্তমান বিশ্ব অচল তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। তাই এমন আরও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠেছে।

১০. আপনি কি এমনটি চান যে, দন্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ইচ্ছামতো ক্ষমা করতে পারবেন না?

মৃত্যু দন্ডপ্রাপ্ত বা যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দলীয় বিবেচনায় ছেড়ে দেওয়ার বাজে উদাহরণ বিগত সময়ে ব্যাপকভাবে দেখা গেছে। এটা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। সকল নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপতির এহেন ক্ষমতা সীমিত করতে এমন বিধান করতে মতামত চাওয়া হচ্ছে।

১১. আপনি কি চান যে, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য থাকুক?

কারণ বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রয়েছে। ফলে কেউ ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে পারে না।

আপনি প্রস্তাবগুলোতে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে সবকিছু উপরের বর্ণনা অনুযায়ী পরিবর্তন করা হবে বলে সরকার বলছেন । পরিবর্তন হবে সংসদে। আগামীতে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তারা এ লক্ষ্যে সংসদে বিল উপস্থাপন করবেন।

আর প্রস্তাবগুলোতে ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পরিবর্তন করা হবে না। কিছুই পরিবর্তন করা যাবে না। তাহলে চব্বিশের আন্দোলন, মানুষের প্রত্যাশা, গণতান্ত্রিক পরিবর্তন কিছুই সম্ভব হবে না।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আলী রিয়াজ, জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সংবিধানের এমন বিষয়গুলোর সংযোজনকে আগামী ৫০ বছরের জন্য বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিবাচক পরিবর্তন বলে উল্লেখ করেন। মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেছেন, আগামী নির্বাচন আগের মতো কোনো বাধা-ধরা নির্বাচন নয়। এটি শুধু পাঁচ বছরের জন্য নয়—এই নির্বাচন আমাদের আগামী ৫০ বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে একটি গণভোট রাখা হয়েছে। আপনি যদি সংস্কার চান, সংসদীয় গণতন্ত্র চান, ক্ষমতা যেন এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না থাকে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হোক, মানুষ যদি বিচার পায়, তাহলে সংস্কারের পক্ষে ভোট দেবেন। সংস্কারের পক্ষে মানে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন। আর যদি মনে করেন সংস্কার চান না, তাহলে ‘না’ ভোট দেবেন। আপনাকে কেউ ভোট দিতে বাধ্য করতে পারবে না।

মনে রাখবেন, পরিবর্তনের চাবি এবার আমাদেরই হাতে। আসুন, নিজেকে পরিবর্তন করি, দেশকে পরিবর্তন করি।

জুলাই সনদ, সংস্কার প্রস্তাব ও গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াতে একটি মহল রাস্তায় নেমেছে। তারা জনগণকে ভুল বুঝাচ্ছে, ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে। উপরে যে বিষয়গুলো বর্ণনা করা হলো এগুলোই জুলাই সনদে রয়েছে। তাহলে জনগণের অমঙ্গল হয় এমন কোন্ ধারাটি এখানে রয়েছে? সুতরাং কোনো ব্যক্তির বিভ্রান্তিকর তথ্যে বিভ্রান্ত হবেন না। নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের অপতথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হবে। যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নিবেন না। প্রাপ্ত তথ্য একাধিক সূত্র থেকে যাচাই করে নিবেন। দেশের কল্যাণে আপনার সুচিন্তিত মতামত দিয়ে গণতান্ত্রিক ধারাকে উন্নত করবেন এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সিনিয়র উপপ্রধান তথ্য অফিসার, পরিচালক, বরিশাল বিভাগীয় জেলা তথ্য অফিস।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *